Posts

ভাষা, শারদ ১৪২৭|২০২০

Image
প্রসঙ্গত  একটা কথা বরাবর বিশ্বাস করেছি। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে খুব বেশি কথা বলতে নেই। যতটুকু মুখবন্ধ না-করলেই নয়, ততটুকুই। বাকি কাজটা পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা, ছবি, অঙ্গসজ্জার। তবু্ও কম-বেশি কিছু বলার থেকেই যায়! ভাষা মুক্তগদ্যের কাগজে পরিণত হয় ২০১৬ সালে। তখন তার বয়স ১৫ বছর। একথা আমাদের পুরোনো পাঠকেরা জানেন। বাংলা ভাষায় পাঁচমিশালি পত্রিকাই সবচেয়ে বেশি। ভাষাও তাই-ই ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট বিষয় বা বিভাগ ধরে কাজের ইচ্ছাও ছিল প্রবল। এরকম কাজ যারা করে, তারা অধিকাংশই কবিতার পত্রিকা। আমাদের নবীনতর পত্রিকা মুক্তধারাও যেমন। গল্পের পত্রিকা হয় অনেক কম। প্রবন্ধের পত্রিকা তুলনায় সামান্য বেশি। কিন্তু মুক্তগদ্যের পত্রিকা আমাদের জানাশোনার পরিধি (যেটা একেবারে ছোটো নয়) পর্যন্ত একটাও ছিল না। অথচ বাংলা লেখালেখির এই প্রগাঢ় সম্ভাবনাময় দিকটি নিয়ে চর্চার সুযোগ ও সম্ভাবনা প্রচুর। এই ভাবনা থেকেই ভাষা মুক্তগদ্যের কাগজে পরিণত হয়। যার জন্য দৈনিক সংবাদপত্রের আলোচনার পাতা থেকে সন্ধিৎসু পাঠকের পাঠ-প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত, অগাধ প্রশ্রয়ে আমরা স্নাত হয়েছি। এখন, ভাষা-র ১৯ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে, আমরা মুক্তগদ্যের পত্রিকা হিসেবেও যখন প…

সোমা দত্ত

Image
আমি আর অরুণিমা 

আমি আর অরুণিমা হাত-ধরাধরি করে চলেছি সেই কুয়োর ভিতরে, যেখানে শরীরের ভিতর থেকে সমস্ত দোষ এক-এক করে খুলে রেখে আমরা মরালীর মতো ভাসতে পারি সবুজ শ্যাওলা ঠেলে। 
অরুণিমা আগে পৃথা ছিল, ক্রমশ পুরুষে-পুরুষে ওর নাম বদল হয়েছে। প্রথমত ওর শাড়িতে বাদামি ক্ষত ছিল, ওর জামায় খোলা সেফটিপিন, ওর চোখের তারায় খুব সরু হয়ে জমেছিল অগভীর হ্রদ, আঙুলের ফাঁকে-ফাঁকে ধারাবাহিক সংস্কারের দাগ, চোখের তারায় ঈষৎ নিকোটিন...
দ্বিতীয়ত শহরের সমস্ত কানাগুলি ছুঁয়ে আসা নিন্দা ছিল ওর বাহুমূলে, প্রশস্ত কপালে ছিল অন্ধকার টিপ, গলা ছুঁয়ে নেমে আসা সুড়ঙ্গপথে অস্থির দাঁতাল মহিষ।
অরুণিমা, যার নাম পৃথা ছিল; অরুণিমা, যে কারও প্রেমিকা ছিল, নির্ভার হয়ে কিছু অস্ফুট জিজ্ঞাসাচিহ্ন তুলে দিল আমার সান্নিধ্যকে। 
আমার পোড়খাওয়া সান্নিধ্য ঈষৎ ময়লা, ধোঁয়াটে বর্ণ চোখের কোটরে...আমার নাম যে-কোনো দীর্ঘ বর্ষাকাল, আমার পরিচয় যে-কোনো ইউক্যালিপটাস, আমার গান সপ্তর্ষিমণ্ডল , আমার হাসি দামোদরের খিদে, আমার প্রতিবাদ ভালোবাসার হাতিয়ার। একদিন আমি যে-কোনো একটি মেয়ে ছিলাম মনে; এখন শুধু শরীর, এখন আমার নারী সাঁতার কাটে শুধুমাত্র শরীরে...
তারপর এল সেই বিপ্লবের র…

রত্নদীপা দে ঘোষ

Image
আয় ফিরে আয় আমার কাছে

ভাবছি। আসলে ভাবছি না কিছুই। এখন ফেরা। ফেরাসুতোর গিনি জড়িয়ে পরবাস থেকে স্বদেশে। ফেরাটি ভাবছে, ফিরতে যখন হবেই, এত কান্না কেনই-বা! মহাশূন্যে শুনশান তাঁতশিফনের জাজিম। তারাগড়া রোদ। রোদের প্রান্তস্টেশন। কী করে দিশাহীন সময় কাটাই এখন, ভাবছে গতজন্মের কবজি। 
শূন্যে দুলছে পা। হাতের মুঠি খুলে দিয়েছে সময়ঘড়ি।
মুহূর্তনাভি বলছে, দ্যাখো চেষ্টা করে। দিগ্বিদিক ঘেঁটে যদি খুঁজে পাও গতজীবনের ওলোসই, গজলবৃক্ষের লাবডুব! দ্যাখো চেষ্টা করে, যদি পারো লিখতে আত্মকলম! কথনের গ্রাম শহুরে জীবন। তিমিনীল সমুদ্র যদি পাও শুনতে, তবে নির্মাণ হলেও হতে পারে সাধকের ছেনি ভাস্করের হাতুড়ি!
কিন্তু এসব কিছুই হয় না। ছায়া তো দূর! মেরামতের আগাম-জামিনটুকুও রাখে না কথা! এমন আশ্চর্যের সম্মুখীন আগে তো হইনি কোনোদিন। এমন অন্ধকার দেখিনি, যা অতিকায় আলোর চাইতে অধিক সম্ভবামি। এমন বাতাসের গতিবেগ, যার আবেগের নিসর্গটি প্রতি ঘণ্টায় যায় বদলে। 
শীত এখানে চরম দমদার। বর্ষার দ্যাখা পাইনি। গ্রীষ্ম বলতে একটু-আধটু ফুঁ। উষ্ণতা খোলা হয়নি এমন দু’একটা মোমবাতি। মহাকাল স্বয়ং ঝুঁকে আছে আয়নায়। ট্রিগারের কাপালিকপনায় ভয় করে না আর। বুঝেছি, মৃত্যুই একম…

রেহানা বীথি

Image
জলমগ্ন জ্যোৎস্না

যখন কেউ ডেকে ওঠে, কষ্ট-কষ্ট গন্ধের ভেতর থেকে জেগে ওঠে মন। যেন জলমগ্ন জ্যোৎস্না। ভাবে, যাবো?  জ্যোৎস্নায় যে বড়ো লোভ আমার! জলেও বড়ো লোভ। জলে ভেসে থাকা যায় ওজনহীন। আমার দেহ-মনের সমস্ত ভার ধারণ করে জল আমাকে নির্ভার করে। জ্যোৎস্না ভাসায় মিঠে আলোয়। ওই আলোতে শুধুই লাবণ্য আর রহস্যময়তা। কষ্টগুলো রহস্যের আড়ালে স্বপ্নের মতো দেখায়। এক নিবিড় সুখ-সুখ অনুভব দেয়। তবে কি কষ্টই সুখ? 
সেই কোন শৈশবের পদ্মপুকুর আজও মনে জেগে আছে। জেগে আছে সেইবেলার কিছু না-পাওয়া, না-পারা। জেগে আছে মনে একটি আবছা ভোর। জেগে থাকে।  যেমন জেগে থাকে নির্ঘুম বয়সী চোখ। গভীর রাতেও থেকে-থেকে বলে ওঠে… কে যায়…কে যেন হাঁটে…কার যেন আওয়াজ পাওয়া যায়!
হাওয়া ভেসে বেড়ায় সর্বত্র। নিস্তব্ধতা হেঁটে বেড়ায় গভীর নিশীথে। ওদেরকেও ডাকে কেউ না-কেউ। কোনো ফুল ফোটার গল্প কিংবা ঝিনুকে একটি মুক্তোদানা খুঁজে পাওয়ার গল্প শোনানো হয়নি ভীষণ কোলাহলে। একটু যদি নিস্তব্ধ আঁধার নেমে আসে, যদি আসে ঘুম-ঘুম বাতাস, শোনানো যাবে ওই গল্পগুলো। একবারও কষ্টের গল্প শোনাবে না। শোনাবে না হতাশার সুর। ভারহীন হয়ে শুধু পাওয়ার গল্পে মশগুল করবে ওদেরকে। যে-কষ্টগুলো রহস্যের আড়ালে…

মন্দিরা ঘোষ

Image
ঈশ্বরকণা

চারপাশে ছড়ানো অজস্র ঈশ্বরকণা। আঁধার সরিয়ে রাতের নির্জন চুপিসার এঁকে দেয় ভোরের নামতায়। ঘুমভাঙা একটি জলশরীর একটু-একটু করে  আলোর ফুলকি হয়ে ওঠে। সূচনা থেকে খুলে যায় প্রত্যহের জানলা। মেঘের মতো আকস্মিক আয়ুর কাছে নত হবার পাঠ পাখিদের এক্তিয়ারে। চুক্তিবদ্ধ ক্লোরোফিল সবুজ পাতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উড়ে যায় কোনো মেঘলা সংগ্রামে।
সরল বীজগণিতের ফর্মুলা ভেঙে কাচঘরে সাজিয়ে ফেলি আমাদের বেঁচে থাকা মেধা। মন ভালো না-থাকার অসুখে মেঘলা চাদরে টুকে রাখি রোদের খরচ।
জীবনের মৌখিক রসায়নে কারচুপির লাইন পেতে ছুটে যায় ভবিতব্যের ব্যানার। আমরা শুধুই পরিণামের ধুলো মেখে ব্যর্থ স্লোগানে বুঁদ হয়ে থাকি। অথচ ভোরের শিশিরও আলোর বাজনা হতে শেখে। শীতের রোদ মেখে হেঁটে যাওয়া দোতারাও জানে জীবন মানে ভেসে থাকা আলোর কুচি, বাউলমনের তারে জেগে ওঠা সবুজ পাখির মফস্বল। আমাদের চোখে আঁধারের হিজাব। আমরা ভুলে গেছি আলোর রঙ কীভাবে একটু-একটু  করে গাঢ় হতে-হতে দৈব হয়ে ওঠে।
ছবি : অ্যান্ড্রু ল্যাঙ্কাস্টার

নন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়

Image
মায়া তবু মায়াবিনী নয়

কিছু-কিছু হিমের রাতে নিজের মুখ আয়নায় দেখলে মনে হয় একটা কঙ্কাল সদ্যপ্রসূতির মতো উবু হয়ে বসে আছে। গোপন পাপের মতো। উস্কোখুস্কো চুল, পোকায় কাটা অলঙ্ঘ্য পাখির ছানার মতো নির্মোক নির্বিকার। আমার মৃত্যু, আমার ক্রোধ, আমার যাবতীয় অব্যক্ত যাযাবর কথারা তখন জীবিত বা মৃত, সংকোচে জড়োসড়ো। ওদের কোনো জাত নেই। ওরা সার বেয়ে ছুঁয়ে যায় জলঙ্গির ঠোঁট। ওরা সুপেয়, পিপাসানিবৃত্তির বিপন্ন ভাণ্ড। হলুদ চিতার মতো একটা বোগেনভিলিয়া ওৎ পেতে বসে আছে শিকারের আশায়। বাতাসে তখন কুর্চিফুলের রাত। লাল-নীল দমকা কিছু হতচ্ছাড়া স্বপ্ন।এ অবশ্য কোনো নতুন কথা নয়।মনের ঘরে বাষ্প জমলে শাল-সেগুনের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হয়। মিলিয়ে যায় খামখেয়ালের স্রোতে। গাছেরা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। টান পড়ে শিকড়ে-শিকড়ে।চোখেমুখে লেগে থাকে আধখাওয়া শুক্লপঞ্চমীর চাঁদ। মাছরাঙা উড়ে যায় এদিক থেকে ওদিক। আকাশ তখন পাথরকুচি লাল। প্রহরীবেশে জ্বালিয়ে রাখে মশাল। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে যক্ষপূরীর মেঘ। হৃদি ঘিরে অক্ষরের তরল নির্যাস। ভালোবাসবে বলে রাস্তায় দাঁড়ায় একলা মানুষ। সমস্ত শরীর ঝাপসা হয়ে আসে। ব্যথায় অসাড়, নিঝুম দৃষ্টি। জল ঝরে তবু হৃদয় নীরব। আগুন জ্বা…